ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই টানটান উত্তেজনা, প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের রোমাঞ্চ আর রাতভর খেলা দেখার আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই অজান্তে তৈরি হতে পারে একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি। বাংলাদেশ সময় অধিকাংশ ম্যাচই গভীর রাতে হওয়ায় অনেকেই টানা কয়েক সপ্তাহ পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি শুধু ক্লান্তি বা মনোযোগ কমিয়ে দেয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কেন কম ঘুম ওজন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে?
পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতি হলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন— ঘ্রেলিন (Ghrelin) ও লেপটিন (Leptin)— এর স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে।
ঘ্রেলিন ক্ষুধার অনুভূতি বাড়ায়, আর লেপটিন মস্তিষ্ককে জানায় যে শরীর পর্যাপ্ত খাবার পেয়েছে। কিন্তু ঘুম কম হলে সাধারণত ঘ্রেলিনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং লেপটিনের মাত্রা কমে যেতে পারে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ক্ষুধা লাগে এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
কেন বাড়ে জাঙ্ক ফুড খাওয়ার ইচ্ছা?
ঘুমের অভাব শুধু ক্ষুধাই বাড়ায় না, বরং মস্তিষ্কের পুরস্কার-সংক্রান্ত (Reward System) অংশকেও বেশি সক্রিয় করে তুলতে পারে। এর ফলে চিপস, বার্গার, পিজা, চকলেট, কোমল পানীয় কিংবা অন্যান্য উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ শরীর তখন শুধু বেশি খাবারই চায় না, বরং তুলনামূলকভাবে অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ে।
বিশ্বকাপের রাত, স্ন্যাকস আর ঘুমের ঘাটতি
বিশ্বকাপের ম্যাচ মানেই অনেকের কাছে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, চা-কফি আর মুখরোচক খাবারের আয়োজন। ম্যাচের উত্তেজনায় কখন যে একের পর এক স্ন্যাকস খাওয়া হয়ে যায়, অনেকেই তা বুঝতেই পারেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাত জাগার ক্লান্তি। পরদিন অনেকেরই হাঁটাচলা কমে যায়, ব্যায়াম বাদ পড়ে বা শারীরিক কার্যকলাপ কমে আসে। ফলে একদিকে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ, অন্যদিকে কম ক্যালরি খরচ—দুটোর সমন্বয়ে ওজন বাড়ার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এক-দুই রাত নয়, সমস্যা তখনই...
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বা দুটি ম্যাচ দেখার জন্য রাত জাগলেই যে শরীরের ওজন বেড়ে যাবে, এমন নয়। তবে টানা কয়েক সপ্তাহ পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে শরীরে দেখা দিতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় নিয়মিত কম ঘুমের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পাশাপাশি মনোযোগ কমে যাওয়া, কর্মক্ষমতা হ্রাস, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং মেজাজের পরিবর্তনের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তাহলে কি বিশ্বকাপ দেখবেন না?
অবশ্যই দেখবেন। ফুটবল বিশ্বকাপ তো প্রতিদিন আসে না। তবে খেলা দেখার আনন্দ যেন দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
- দিনের অন্য সময় সুযোগ থাকলে কিছুটা ঘুম পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
- ম্যাচ দেখতে গিয়ে চিপস, কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুডের পরিবর্তে ফল, বাদাম বা অন্যান্য তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন।
- পরদিন অন্তত ২০–৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।
- বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক ঘুমের রুটিনে ফিরে আসুন।
বিশ্বকাপের উত্তেজনা কয়েক সপ্তাহের, কিন্তু সুস্থ শরীরের প্রয়োজন সারা বছরের। তাই প্রিয় দলের প্রতিটি ম্যাচ উপভোগ করুন, তবে রাত জাগাকে অভ্যাসে পরিণত করবেন না। মনে রাখবেন, নিয়মিত ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রামই দেয় না; এটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ, হরমোনের ভারসাম্য, বিপাকক্রিয়া এবং সুস্থ ওজন বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বিশ্বকাপের আনন্দ আর সুস্থ জীবন— দুটোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।


